
মোঃ নিজাম উদ্দিন, (মিজান):
বাংলাদেশের প্রধান শহর অন্যতম শিল্পাঞ্চল গুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট সহ অন্যান্য শিল্প অঞ্চলে ব্যাপক গ্যাস সংকট। বাংলাদেশের অর্থনীতি, আমদানি-রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদনে এ শহরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিল্প অঞ্চল এলাকায় গ্যাস সরবরাহে সংকট দেখা যাচ্ছে। বাসাবাড়িতে রান্নার সময় গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় গ্যাস থাকছে না। একই সঙ্গে শিল্পকারখানাগুলোতেও গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদনব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে এর প্রভাব শুধু ভোক্তা পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অর্থনৈতিক, শিল্প ও কর্মসংস্থানেও পড়বে।
বাসাবাড়ির গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে চুলায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় রান্না করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেককে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে বাড়ছে পারিবারিক ব্যয়। গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ একটি মৌলিক নাগরিক সেবার অংশ—তাই এ ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না বলে মনে করেন ভোক্তারা।
অন্যদিকে দেশের শিল্পকারখানার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। উৎপাদননির্ভর শিল্পে গ্যাসের চাপ নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে নেমে গেলে যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো অসম্ভব। উৎপাদন কমে গেলে বাড়ে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা। শিল্প কারখানা গুলোতে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করতে হলে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়ের উপর প্রভাব পরে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের শ্রমিক গুলো দৈনন্দিন জীবনে চরম বিঘ্ন ঘটে।দেশের গ্যাস সংকটকে শুধু জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তবে সংকটের কারণ নিয়েও বাস্তবসম্মত ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন। গ্যাসের জাতীয় উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ, পাইপলাইনের সক্ষমতা, চাহিদা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার নানা সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব থাকতে পারে। শুধু দায় চাপানোর বদলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর উচিত সমস্যা চিহ্নিত করে এলাকাভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা।
সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ জরুরি। প্রথমত, স্বল্পমেয়াদে প্রধান শহর ও শিল্প অঞ্চলে আবাসিক ও সিএনজি- শিল্প গ্রাহকদের জন্য গ্যাস সরবরাহের একটি বাস্তবসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কোন এলাকায় কখন চাপ কমছে, কত ঘণ্টা সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে এবং সিএনজি শিল্পকারখানাগুলো কী ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুরোনো পাইপলাইন ও বিতরণ অবকাঠামো পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় সংস্কার, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া।
ঢাকা ও চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বলা হয়। সেই শহরের সিএনজি চালক, মালিক ও বাসিন্দাদের যদি প্রতিদিন সিএনজি ও রান্নার গ্যাস নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হয় এবং শিল্পকারখানাকে উৎপাদন চালাতে গিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। নাগরিক সেবা ও শিল্প উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
সংকট দীর্ঘায়িত করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সহ দেশের শিল্প অঞ্চলের মানুষ ও শিল্পোদ্যোক্তারা আশ্বাস নয়, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহের বাস্তব সমাধান চায়। বাংলাদেশের সরকার দলীয় ও বিরোধী দলীয় উচিত প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, স্বচ্ছ তথ্য এবং দ্রুত বাস্তবায়ন হলে এই সংকট থেকে বেড়িয়ে আশা সম্ভব।