• বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনামঃ
গ্যাস সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: যাঁতাকলে জনজীবন বাড়ছে দুর্ভোগ, সমাধান কোথায়? চর বিশ্বাস ইউনিয়নের আগামীর ভাবনা: চেয়ারম্যান প্রার্থী আলহাজ্ব আমজাদ হোসেন গাজীকে ঘিরে প্রত্যাশা আলিমে সাফল্যের শীর্ষে দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৯২ শিক্ষার্থী খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার পক্ষে অসহায় পরিবারের পাশে ইয়ুথ ড্রিম, খাদ্যসামগ্রী ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ সাংবাদিক আজমির হোসেন তালুকদারের বাসায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার সাংবাদিকদের নিয়ে চিকিৎসকের অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিবাদ বিএমএসএফের সিআইডি পুলিশের স্ত্রীর মামলায় বিএমএসএফের আইনজীবীরা ৩ সাংবাদিকের জামিন দেশে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করলে জবাব দিবে বিএনপি: ইসরাফিল খসরু নেত্রকোনায় সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে হত্যা শোক ও প্রতিবাদ: বিএমএসএফের মা ইলিশ সংরক্ষণে বিভিন্ন সমূদ্র উপকূল সাগরে নৌবাহিনীর অভিযান অব্যাহত

গ্যাস সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: যাঁতাকলে জনজীবন বাড়ছে দুর্ভোগ, সমাধান কোথায়?

প্রতিনিধির নাম / ২৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

মোঃ নিজাম উদ্দিন (মিজান):-

গ্যাস—আধুনিক জীবনযাত্রার অন্যতম অপরিহার্য জ্বালানি। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গ্যাসের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশে গ্যাস সংকট এখন আর নতুন কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের এক জটিল জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। একদিকে গ্যাসের তীব্র সংকট, অন্যদিকে দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি—এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।

একসময় দেশের অধিকাংশ পরিবার পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক এলাকায় দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। কোথাও গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে গ্যাসের সংকট সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং ছোট শিশু রয়েছে এমন পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়।

অন্যদিকে যেসব পরিবার সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের দুর্ভোগও কম নয়। বাজারে এলপিজির দাম বাড়লে সরাসরি তার প্রভাব পড়ে পারিবারিক বাজেটে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতি মাসে গ্যাসের বাড়তি ব্যয় বহন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং জ্বালানি ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে সাধারণ মানুষের আয়ের বড় একটি অংশ শুধু জীবনধারণের খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়।

দেশের শিল্পকারখানাগুলোও এর কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ কিংবা অনিয়মিত সরবরাহের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ে, পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় প্রতিষ্ঠানগুলো পিছিয়ে পড়ে। নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি সংকটের কারণে বেশি চাপে পড়ে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে পারলেও ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কঠিন। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, গ্যাস সংকটের মূল কারণ কী? এর পেছনে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন হ্রাস, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণব্যবস্থার নানা দুর্বলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনও আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে সংকটের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যথাযথ বিনিয়োগ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। জ্বালানির উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বাড়লে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই মূল্যবৃদ্ধির বোঝা যদি সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়াবে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর কথা বিবেচনায় না নিয়ে জ্বালানির দাম বাড়ানো কোনোভাবেই জনবান্ধব সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
এখানে সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সমুদ্রাঞ্চলসহ সম্ভাবনাময় এলাকায় অনুসন্ধানের উদ্যোগ বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার পুরোনো পাইপলাইন সংস্কার এবং সিস্টেম লস কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, আমদানিনির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিকল্প জ্বালানির প্রসার ঘটাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
পাশাপাশি গ্যাস ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ সংযোগ, গ্যাস চুরি এবং অপচয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। যেসব এলাকায় গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য ও পরিকল্পিত বণ্টনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতের মধ্যে সমন্বিত জ্বালানি বণ্টন নিশ্চিত করাও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্প খাতের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন হলে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা কিংবা ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, গ্যাস কেবল একটি জ্বালানি নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গ্যাসের সংকট মানে শুধু রান্নার চুলা বন্ধ থাকা নয়, এর অর্থ শিল্প উৎপাদনে বাধা, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি।
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বড় বড় অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। মানুষ যদি ন্যায্য মূল্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পায়, রান্নার চুলা জ্বালাতে হিমশিম খায় এবং প্রতিনিয়ত মূল্যবৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অতএব, গ্যাস সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং জনবান্ধব জ্বালানি নীতি। গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এখন সময়ের দাবি। কারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই শুধু অর্থনীতিকে সচল রাখা নয়, বরং কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd