
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব থেকে এখন পর্যন্ত বাঙালির শক্তির বিনাশ নেই। শুধু ধাপে ধাপে বাঙালির শক্তির রুপান্তর ঘটে। তেমনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের শক্তি রুপান্তরের জন্য এই বিশাল দৈত্যেরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। শুধু শক্তির রুপান্তর ঘটে নাই পল্লী চিকিৎসক নামক এই অদ্ভুত প্রাণীর। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এই বিশাল দৈত্যের কবলে ঝিমিয়ে পরছে কমিউনিটি প্যারামেডিক বা পল্লী চিকিৎসক নামক এই অদ্ভুত প্রাণী। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজন বা গুরুত্ব আছে কি এই পল্লী চিকিৎসকের? তা নিয়ে নানা মতামত বাংলাদেশের সুশীল সমাজের।
বিশ দশকের পূর্বের ইতিহাসঃ- বাংলাদেশের ভূখণ্ডে স্বাস্থ্য খাতে অদ্ভুত এই প্রাণী তখনকার সময় দৈত্যের ন্যায় ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান সুশীল সমাজের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছে, তাদের শৈশব ও পূর্ব পুরুষদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে পল্লী চিকিৎসকদের গুরুত্ব বুঝতে পারবেন। বাংলাদেশের প্রায় ৮৫% গ্রামীণ ও শহরের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিশেষ সেবা দিয়ে আসছেন।তাদের প্রশিক্ষণ, মেধা, পরিশ্রম ও সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতেন। তখনকার মহামারী কলেরা, ডায়রিয়া ও গুটিবসন্ত সহ অনেক রুগীদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিকার করার চেষ্টা চালিয়ে যেত এই অদ্ভুত প্রাণী। উপকূলীয় গ্রাম, থানা ও জেলা শহরের জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য খাত এগিয়ে নেওয়ার জন্য নানা পরিকল্পনা করতেন। তখনকার সময় দৈত্যের অবদান ছিল খুবই কম এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর একমাত্র ভরসার নাম ছিলো কমিউনিটি প্যারামেডি বা পল্লী চিকিৎসক। এই কমিউনিটি প্যারামেডি বা পল্লী চিকিৎসক নামক এই অদ্ভুত প্রাণীকে শক্তিশালী করার জন্য পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকার
১৯১৪ সালে দি ষ্টেট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি অব বেঙ্গল, ১৯৪৭ সালে দি ষ্টেট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি অব ইস্ট পাকিস্তান, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে, ডিপ্লোমা মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (DMF), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কোর্স চালু হয়। কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসক নামক অদ্ভুত প্রাণী কোর্স গুলো সম্পূর্ণ করে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করা হয়। দিন, রাত, ঝড়-বৃষ্টি এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগনের সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও যক্ষ্মা সনাক্ত করন স্বাস্থ্য সেবার অধিকার আদায় কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসক দিয়ে থাকে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সভা সেমিনারে কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসকের ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানঃ- বাংলাদেশের কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসককে প্রতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়ার জন্য ১৯৭৮ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ২৭০ টি থানায় স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করেন। ৩০,০০০ (ত্রিশ হাজার) পল্লী চিকিৎসক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং দি ষ্টেট মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠান তাদেরকে সনদ প্রদান করেন। তখন এই প্রকল্পের জন্য সরকার ৩১ (একত্রিশ) হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও মাত্র ১০ (দশ) হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়।
বিশ দশকের পরের অবস্থাঃ- বর্তমানে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসায় নিয়োজিত। তারা সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যসেবা সেবার মানোন্নয়ন করার জন্য সারা বাংলাদেশে ১৮ (আটার) হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করেন। এসকল কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোতে কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যসেবার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ২০২০ সালে পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় থাকবে যে, মহামারী করোনা ভাইরাস সমগ্র পৃথিবী এলোমেলো করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। তখন এমবিবিএস ডাক্তার পাওয়া ও তাদের চিকিৎসা নেওয়া ছিলো বড় ভাগ্যের বিষয়। সে সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিভিন্ন সেবা নিয়ে এই পল্লী চিকিৎসক। ২০২১ সালে বাংলাদেশের সাধারণ জনগোষ্ঠী অনুভূতি প্রকাশ করেছেন পল্লী চিকিৎসক নিয়ে।
বাংলাদেশে পল্লী চিকিৎসকের কার্যক্রমঃ-
১। প্রত্যন্ত অঞ্চল ও শহরের জনবহুল এলাকায় মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পল্লী চিকিৎসক দিয়ে থাকে।
২। গ্রাম ও শহরের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ এবং সচেতনতা বাড়াতে পল্লী চিকিৎসক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।
৩। প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা, অপুষ্টিজনিত রোগের চিকিৎসা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, যক্ষ্মা রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা, যৌনবাহিত রোগ এইচআইভি/এইডস সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা।
৪। এমবিবিএস ডাক্তার স্বল্পতা কারণে গ্রাম ও শহরের জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা পল্লীচিকিৎসক দিয়ে থাকেন।
৫। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে পল্লী চিকিৎসকের গুরুত্ব ও ভুমিকা অতুলনীয়।
কমিউনিটি প্যারামেডিক্যাল ও পল্লী চিকিৎসকের দাবি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গ্রাম ও শহরের জনবহুল এলাকার জনগোষ্ঠীকে আমরা সঠিক ভাবে সেবা দিতে চাই। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের এই সেবা পরিচালনা করার জন্য সরকারের কাছে সকল সহযোগিতা কামনা করছি এবং সকল ধরনের হয়রানি ও প্রতিহিংসা মূলক আচরণ থেকে মুক্তি চাই।
মোঃ নিজাম উদ্দিন (মিজান)
সাংবাদিক ও কলামিস্ট