নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:-
চট্টগ্রাম মহানগরের দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানে কার্যকর নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট, রবিবার বিকেল ৪টায় নগরীর সিআরবি এলাকার তাসফিয়া রেস্টুরেন্টে এ উপলক্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান আবু সৈয়দ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন।
সভায় চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা, জনদুর্ভোগ, উন্নয়ন ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা, যানজট, সড়ক যোগাযোগ, খাল-নালা ও নদী দখল-দূষণ, পরিবেশ বিপর্যয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা, জননিরাপত্তা ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে বক্তারা মতামত তুলে ধরেন।
সভায় বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এ অঞ্চলে থাকলেও নাগরিক জীবনে নানা সংকট দীর্ঘদিন ধরে বিরাজ করছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজেরও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
২০১৫ সাল থেকে নাগরিক আন্দোলনে বৃহত্তর পরিসর
সভায় মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “আমরা ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম গঠন করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা সমাধানের দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন করে আসছি। চট্টগ্রামের মানুষের নাগরিক অধিকার, উন্নয়ন ও ন্যায্য দাবিগুলো নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করছি।”
তিনি বলেন, “সময় ও বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যা ও প্রত্যাশার পরিধিও বেড়েছে। তাই সময়ের দাবিতে সংগঠনের সাংগঠনিক পরিধি বৃদ্ধি করা হয়েছে। শুধু চট্টগ্রাম মহানগর নয়, বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলার মানুষের অভিন্ন স্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।”
মো. কামাল উদ্দিন বলেন, “চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িকে সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামকে মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ—এই তিনটি সাংগঠনিক অঞ্চলে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি গঠন করা হলো।”
‘দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে মানুষের জন্য কাজ করবে’
বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের অরাজনৈতিক চরিত্র তুলে ধরে মহাসচিব বলেন, “এই সংগঠন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও জনকল্যাণমূলক। কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও পেশার ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের ন্যায্য নাগরিক অধিকার ও দাবির পক্ষে কথা বলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, “নাগরিক ফোরাম শুধু সমস্যা তুলে ধরে থেমে থাকতে চায় না। আমরা সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করতে চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাব দিতে চাই এবং জনগণকে সম্পৃক্ত করে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ে ভূমিকা রাখতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ নয়; প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোও নিশ্চিত করতে হবে। নগরবাসীর জীবনযাত্রা সহজ না হলে উন্নয়নের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।”
যেসব সমস্যা নিয়ে কাজ করবে মহানগর কমিটি
সভায় চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম নগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
এছাড়া যানজট, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, খাল-নালা দখল ও ভরাট, কর্ণফুলীসহ বিভিন্ন জলাধারের দূষণ, পাহাড় কাটা, পরিবেশ বিপর্যয় এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, এসব সমস্যা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন মহানগর কমিটি এ ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, মহানগর কমিটি নগরীর বিভিন্ন এলাকার নাগরিক সমস্যা পর্যায়ক্রমে চিহ্নিত করবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব তৈরি করা হবে।
পরবর্তীতে এসব সমস্যা সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজন হলে সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি, মানববন্ধন, গোলটেবিল আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক দাবিগুলো তুলে ধরা হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন যারা
সভায় কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান আবু সৈয়দ ও কেন্দ্রীয় মহাসচিব মো. কামাল উদ্দিন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন **এম হামিদ হোসাইন, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন মানিক, নাহিদা আকতার নাজু, ওয়াহিদুল্লাহ, লায়ন মো. জিল্লুর রহমান শাকিল, দুলাল কান্তি বড়ুয়া, মিনহাজ উদ্দিন চৌধুরী, অরুপ, এস বি সুমি, এম আলী রুহি, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, বেলাল উদ্দিন, মনজু আলম, বিপ্লব বিজয়, রিপন চৌধুরী, সৈয়দ মোহাম্মদ সেলিম, মহসিন বাবলু, মোহাম্মদ ওয়াহিদুল আলম, আসিশ, ওমর আলী রনি, রাজু ও বাউল জুয়েলসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
নবগঠিত মহানগর কমিটি
সভায় আলোচনা শেষে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়।
সভাপতি: এম হামিদ হোসাইন, সিনিয়র সহসভাপতি : লায়ন মো. জিল্লুর রহমান শাকিল, সহ-সভাপতি: মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন মানিক, সহ-সভাপতি: নাহিদা আকতার নাজু, সহ-সভাপতি: ওয়াহিদুল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক দুলাল কান্তি বড়ুয়া, সহ-সভাপতি: মিনহাজ উদ্দিন চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক: অরুপ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক: এস বি সুমি, প্রচার সম্পাদক: এম আলী রুহি, তথ্য ও প্রচার সম্পাদক: বিপ্লব বড়ুয়া, দপ্তর সম্পাদক: মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান
সভায় নবগঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দ সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
‘নতুন কমিটি নাগরিকদের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবে’
সভাপতির বক্তব্যে কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান আবু সৈয়দ বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি গঠনের মাধ্যমে নগরীর নাগরিক আন্দোলন আরও সুসংগঠিত হবে। তিনি নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দকে দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, নাগরিক সমস্যা সমাধানে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নগরবাসীর কথা শুনে তাদের সমস্যা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে।
সভায় উপস্থিত অন্যান্য নেতৃবৃন্দও নবগঠিত কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরের নাগরিক সমস্যা সমাধানে ঐক্যবদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।
সভা শেষে বৃহত্তর চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়। আগামী দিনে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা চিহ্নিত করে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।